প্রজন্ম ধরে ভারতীয় খাদ্যতালিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে দুগ্ধজাত পণ্য। পনির হোক বা দই—আমিষ বা নিরামিষ নির্বিশেষে দুধই আমাদের জীবনের অন্যতম প্রাথমিক খাদ্য। এমনকি একটি শিশু যখন অন্য কিছু খেতে পারে না, তখন দুধই তার প্রধান ভরসা। ক্যালসিয়াম, উচ্চমানের প্রোটিন এবং প্রয়োজনীয় ভিটামিন সমৃদ্ধ এই খাবারগুলি শরীরের বৃদ্ধি, হাড়ের শক্তি এবং পেশি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্কুল অফ পাবলিক হেলথ’-এর এক গবেষণা অনুযায়ী, যারা পূর্ণ চর্বিযুক্ত (Full-fat) দুগ্ধজাত পণ্য খান, তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি কিছুটা কম থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দুগ্ধজাত পণ্য কি সত্যিই সবার জন্য সমান স্বাস্থ্যকর.
দুগ্ধজাত পণ্য আসলে কী?
সহজ কথায়, পশুর দুধ থেকে তৈরি সমস্ত খাদ্যদ্রব্যই হলো দুগ্ধজাত পণ্য। এর মধ্যে কেবল তরল দুধ নয়, বরং দুধ জমাট বাঁধিয়ে, মন্থন করে বা গেঁজিয়ে (Fermentation) তৈরি করা দই, ছানা, পনির, মাখন ও ঘি—সবই অন্তর্ভুক্ত। পুষ্টির দিক থেকে এগুলি প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এবং বি-১২ এর চমৎকার উৎস।
কোন বয়সে কতটা প্রয়োজন?
বয়স এবং হজম ক্ষমতা অনুযায়ী দুগ্ধজাত পণ্যের নির্বাচন আলাদা হওয়া উচিত:
* শিশু (০-১২ মাস): নবজাতকদের জন্য শুধুমাত্র মায়ের দুধই শ্রেষ্ঠ। ৬ মাস পর থেকে সামান্য দই দেওয়া যেতে পারে।
* বাচ্চা (১-৩ বছর):** এদের জন্য গরুর দুধ সবথেকে ভালো। পাশাপাশি পূর্ণ চর্বিযুক্ত দই বা পনির দেওয়া যায়।
* কিশোর-কিশোরী (৯-১৮ বছর): এই বয়সে দ্রুত বৃদ্ধির জন্য ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের চাহিদা বাড়ে। তাই দুধ, দই ও পনির নিয়মিত খাওয়া জরুরি।
* প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রবীণ: প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য গ্রিক ইয়োগার্ট বা পনির ভালো বিকল্প। তবে ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দই বা ঘোল (Buttermilk) বেশি উপকারী, কারণ এগুলি সহজে হজম হয়।
পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা: এক নজরে
* দই: ১০০ গ্রাম সাধারণ দইতে ৩.৫ গ্রাম প্রোটিন থাকে। এটি অন্ত্রের স্বাস্থ্যের (Gut health) জন্য দারুণ কার্যকর।
* ঘি: এক টেবিল চামচ ঘিতে প্রায় ১৩০ ক্যালোরি থাকে। এর বিউটিরিক অ্যাসিড হজম প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে।
* পনির: পেশি গঠন এবং দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে পনিরের জুড়ি নেই।
সতর্কতা: কাদের এড়িয়ে চলা উচিত?
সব দুগ্ধজাত পণ্য সবার জন্য নিরাপদ নয়।
১. ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স: যাদের দুধ খেলে গ্যাস, পেট ব্যথা বা বদহজম হয়, তাদের সাধারণ দুধ এড়িয়ে চলা উচিত।
২. অ্যালার্জি: অনেকের দুধের প্রোটিন থেকে ত্বকে ফুসকুড়ি বা শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
৩. হৃদরোগ ও ডায়াবেটিস: অতিরিক্ত চর্বি বা চিনিযুক্ত দুগ্ধজাত পণ্য (যেমন ফ্লেভারড মিল্ক) ওজন ও রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে ‘স্যাচুরেটেড ফ্যাট’ এড়িয়ে চলাই ভালো।
৪. কাঁচা দুধ: পাস্তুরিত না করা কাঁচা দুধ খেলে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
বিকল্প কী হতে পারে?
যারা ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের সমস্যায় ভুগছেন বা যারা প্রাণীজ পণ্য এড়িয়ে চলতে চান, তারা উদ্ভিদ-ভিত্তিক বিকল্প বেছে নিতে পারেন। যেমন:
* সয়া মিল্ক (Soya Milk)
* বাদাম দুধ (Almond Milk)
* ওটস মিল্ক (Oat Milk)
* নারকেলের দুধ (Coconut Milk)
একজন সুস্থ মানুষের জন্য দিনে ২ থেকে ৩ বার পরিমিত পরিমাণে দুগ্ধজাত পণ্য গ্রহণ করা নিরাপদ। তবে শরীরের অবস্থা বুঝে সঠিক পণ্যটি বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।